
হাছন রাজা (২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ – ৭ ডিসেম্বর ১৯২২)
হাছন রাজা ছিলেন বাংলাদেশের একজন মরমী কবি ও বাউল শিল্পী। তিনি লালন শাহ-এর ধারাবাহিক পথিকৃৎ হিসেবে সমাদৃত। হাছন রাজার মরমী সাধনা দর্শনচেতনার সাথে সঙ্গীতের অনন্য সংযোগ ঘটিয়েছে। তার গান ও সাধনা জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সর্বমানবিক চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।
জীবনী
জন্ম ও পরিবার: হাছন রাজার জন্ম ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর, সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা নদীর তীরে লক্ষণছিরি (লক্ষণশ্রী) গ্রামে। তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
শৈশব ও শিক্ষা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করলেও হাছন রেজা ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি সহজ-সরল ভাষায় সহস্রাধিক মরমী গান রচনা করেছেন।
যৌবনকাল ও বৈরাগ্য: প্রথম যৌবনে তিনি ভোগবিলাসী ছিলেন। পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক স্বপ্ন ও বাস্তব ঘটনার প্রভাবে (যেমন ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে পোষা হাতির মৃত্যু) হাছন রাজার জীবনে বৈরাগ্য ও মরমী ভাবের সূচনা হয়। বিলাসবিলাসী জীবন পরিত্যাগ করে তিনি মানবসেবা ও জীবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
সঙ্গীত সাধনা
হাছন রাজার গান ও সাধনার মূল বৈশিষ্ট্য:
ঈশ্বানুরক্তি, জগৎ জীবনের অনিত্যতা, মানুষের প্রমোদমত্তার প্রতি সচেতনতা
হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়
আঞ্চলিক শব্দ, গ্রামীণ সাবলীল ভাষা এবং লোকধারার ব্যবহার
'হাছন উদাস' গ্রন্থে ২০৬টি গান সংকলিত, এছাড়া অন্যান্য পত্রপত্রিকায় আরও গান প্রকাশিত
প্রধান গ্রন্থসমূহ:
হাছন উদাস – সংকলিত গানসমূহ
শৌখিন বাহার
হাছন বাহার
কিছু জনপ্রিয় গান
"লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার"
"মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে"
"আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে"
"আমি যাইমুরে আল্লার সঙ্গে"
"একদিন তোর হইব রে মরন রে হাছন রাজা"
রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাছন রাজার গানের দর্শনচিন্তাকে সমাদৃত করেছেন। ১৯২৫ সালের Indian Philosophical Congress-এ তিনি হাছন রাজার দুটি গান উদ্ধৃত করে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দর্শনের প্রশংসা করেছেন।
মৃত্যু
হাছন রাজা ৬ ডিসেম্বর ১৯২২ সালে মৃত্যু বরণ করেন। তার সমাধি সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার গাজীর দরগায় অবস্থিত।